মাদারগঞ্জ ০১:২২ অপরাহ্ন, সোমবার, ০১ জুন ২০২৬
শিরোনাম ::
Logo মাদারগঞ্জে বজ্রপাতে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী অজ্ঞান Logo মাদারগঞ্জের বেতাগায় পানিতে ডুবে দেড় বছরের শিশু ইয়ামিনের মর্মান্তিক মৃত্যু Logo কাদাপানি আর খানাখন্দের দিন শেষ, বদলে যাচ্ছে জোনাইল বটতলা সড়ক Logo সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কে ‘পুকুর’! মাদারগঞ্জে হাজারো মানুষের নিত্যদিনের ভোগান্তি Logo কৃষিকাজের সময় বজ্রাঘাতে প্রাণ গেল মাদারগঞ্জের ছাত্রনেতার Logo জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে গলায় লিচুর বিচি আটকে শিশুর মৃ/ত্যু Logo মোসলেমাবাদ মেট্রো সড়ক: প্রকৃতির বুকে গড়ে ওঠা এক নতুন সম্ভাবনার নাম Logo দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শুরু হলো রাস্তার উন্নয়ন কাজ, খুশির জোয়ার বারই পাড়ায় Logo স্বামী নিখোঁজ ৭ বছর ঝড়ে ভাঙলো শেষ আশ্রয় Logo বিদেশিনী স্ত্রী নিয়ে দেশে ফিরলেন মাদারগঞ্জের ইসমাইল

স্বামী নিখোঁজ ৭ বছর ঝড়ে ভাঙলো শেষ আশ্রয়

আকাশ মন্ডল মাদারগঞ্জ (প্রতিনিধি)
  • প্রকাশ : ০৩:৫৮:৩৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬
  • / ৫৩৫ বার পড়া হয়েছে

জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার চরপাকেরদহ ইউনিয়নের তেঘরিয়া ফকিরপাড়া গ্রামের অসহায় নারী গুলেজা বেগমের জীবন যেন এক হৃদয়বিদারক সংগ্রামের নাম। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা আর কষ্টের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন তিনি। প্রায় সাত বছর আগে প্রতিবন্ধী স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই একমাত্র সন্তানকে নিয়ে শুরু হয় তার কঠিন জীবনযুদ্ধ। সেই যুদ্ধের মাঝেই সম্প্রতি কালবৈশাখীর ভয়াবহ ঝড়ে ভেঙে যায় তাদের একমাত্র বসতঘর। এরপর থেকে প্রায় ১৫ দিন ধরে ১২ বছর বয়সী ছেলে পরানকে নিয়ে খোলা আকাশের নিচেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন গুলেজা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গুলেজার স্বামী ছিলেন শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও স্বামী-সন্তানকে নিয়ে কোনোভাবে চলছিল তাদের জীবন। কিন্তু প্রায় সাত বছর আগে হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়ে যান তার স্বামী। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তিনি জীবিত নাকি মৃত—সেই খবরও জানেন না গুলেজা। স্বামী হারানোর পর একমাত্র সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি। সংসারের দায়িত্ব পুরোপুরি এসে পড়ে তার কাঁধে।
অভাবের সংসারে নিয়মিত কাজও জোটে না গুলেজার। কখনো মানুষের বাড়িতে কাজ করে, কখনো সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে কোনোমতে চলে মা-ছেলের জীবন। অনেক সময় ঠিকমতো তিনবেলা খাবারও জোটে না। তবুও ছেলেকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। ছোট্ট একটি টিনের ঘরই ছিল তাদের শেষ সম্বল, শেষ আশ্রয়। কিন্তু কয়েকদিন আগে কালবৈশাখীর তাণ্ডবে সেই আশ্রয়টুকুও ধ্বংস হয়ে যায়।

প্রবল ঝড় ও বৃষ্টির সময় মুহূর্তের মধ্যেই ভেঙে পড়ে ঘরটি। টিন উড়ে যায়, বাঁশের খুঁটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ঘরের ভেতরে থাকা কাপড়চোপড়, বিছানাপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। এক নিমিষেই নিঃস্ব হয়ে পড়েন গুলেজা। ঝড় থেমে গেলেও থামেনি তাদের দুর্ভোগ।
ঘর ভেঙে যাওয়ার পর থেকে খোলা আকাশের নিচেই দিন-রাত কাটাতে হচ্ছে মা-ছেলেকে। কখনো ভাঙা ঘরের পাশে পলিথিন টানিয়ে, কখনো প্রতিবেশীর বাড়ির বারান্দায় আশ্রয় নিয়ে রাত পার করছেন তারা। বৃষ্টি এলেই আতঙ্কে থাকতে হয়। গভীর রাতে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে ভিজে যায় বিছানা, কাপড় আর শরীর। রোদের দিনেও কষ্ট কম নয়। প্রচণ্ড গরমে খোলা আকাশের নিচে থাকতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ার শঙ্কায় রয়েছেন তারা।
১২ বছর বয়সী ছেলে পরানও মায়ের সঙ্গে কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। পড়াশোনার বয়সে তাকে এখন ভাবতে হচ্ছে কোথায় রাতে ঘুমাবে, কীভাবে বৃষ্টি থেকে বাঁচবে। শিশু বয়সেই দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে সে।
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে গুলেজা বলেন, “আমার প্রতিবন্ধী স্বামী সাত বছর ধরে নিখোঁজ। কোথায় আছে, বেঁচে আছে কি না কিছুই জানি না। ছেলে নিয়ে মানুষের সাহায্যে বেঁচে আছি। অনেক সময় ঠিকমতো খাবারও জোটে না। তারপরও ছোট্ট একটা ঘরে ছিলাম। কিন্তু ঝড়ে সেই ঘরটাও ভেঙে গেল। এখন খোলা আকাশের নিচে থাকতে হচ্ছে। বৃষ্টি এলে খুব ভয় লাগে। আমার ছেলেটাকে নিয়ে কোথায় যাবো বুঝতে পারছি না। এতদিন হয়ে গেল, কেউ খোঁজ নিতে আসেনি। সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষের কাছে আমার আকুতি—আমাকে একটি ঘর করে দিন।”
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, গুলেজা দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত কষ্টে জীবনযাপন করছেন। ঝড়ে ঘর ভেঙে যাওয়ার পর তার দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। দ্রুত প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে এসে তার জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
এলাকাবাসীর দাবি, অসহায় এই মা-ছেলের পাশে দাঁড়ানো এখন মানবিক দায়িত্ব। একটি নিরাপদ আশ্রয় পেলে অন্তত খোলা আকাশের নিচে অনিশ্চয়তার জীবন থেকে মুক্তি পাবে গুলেজা ও তার শিশু সন্তান।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

স্বামী নিখোঁজ ৭ বছর ঝড়ে ভাঙলো শেষ আশ্রয়

প্রকাশ : ০৩:৫৮:৩৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬

জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার চরপাকেরদহ ইউনিয়নের তেঘরিয়া ফকিরপাড়া গ্রামের অসহায় নারী গুলেজা বেগমের জীবন যেন এক হৃদয়বিদারক সংগ্রামের নাম। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা আর কষ্টের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন তিনি। প্রায় সাত বছর আগে প্রতিবন্ধী স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই একমাত্র সন্তানকে নিয়ে শুরু হয় তার কঠিন জীবনযুদ্ধ। সেই যুদ্ধের মাঝেই সম্প্রতি কালবৈশাখীর ভয়াবহ ঝড়ে ভেঙে যায় তাদের একমাত্র বসতঘর। এরপর থেকে প্রায় ১৫ দিন ধরে ১২ বছর বয়সী ছেলে পরানকে নিয়ে খোলা আকাশের নিচেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন গুলেজা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গুলেজার স্বামী ছিলেন শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও স্বামী-সন্তানকে নিয়ে কোনোভাবে চলছিল তাদের জীবন। কিন্তু প্রায় সাত বছর আগে হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়ে যান তার স্বামী। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তিনি জীবিত নাকি মৃত—সেই খবরও জানেন না গুলেজা। স্বামী হারানোর পর একমাত্র সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি। সংসারের দায়িত্ব পুরোপুরি এসে পড়ে তার কাঁধে।
অভাবের সংসারে নিয়মিত কাজও জোটে না গুলেজার। কখনো মানুষের বাড়িতে কাজ করে, কখনো সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে কোনোমতে চলে মা-ছেলের জীবন। অনেক সময় ঠিকমতো তিনবেলা খাবারও জোটে না। তবুও ছেলেকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। ছোট্ট একটি টিনের ঘরই ছিল তাদের শেষ সম্বল, শেষ আশ্রয়। কিন্তু কয়েকদিন আগে কালবৈশাখীর তাণ্ডবে সেই আশ্রয়টুকুও ধ্বংস হয়ে যায়।

প্রবল ঝড় ও বৃষ্টির সময় মুহূর্তের মধ্যেই ভেঙে পড়ে ঘরটি। টিন উড়ে যায়, বাঁশের খুঁটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ঘরের ভেতরে থাকা কাপড়চোপড়, বিছানাপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। এক নিমিষেই নিঃস্ব হয়ে পড়েন গুলেজা। ঝড় থেমে গেলেও থামেনি তাদের দুর্ভোগ।
ঘর ভেঙে যাওয়ার পর থেকে খোলা আকাশের নিচেই দিন-রাত কাটাতে হচ্ছে মা-ছেলেকে। কখনো ভাঙা ঘরের পাশে পলিথিন টানিয়ে, কখনো প্রতিবেশীর বাড়ির বারান্দায় আশ্রয় নিয়ে রাত পার করছেন তারা। বৃষ্টি এলেই আতঙ্কে থাকতে হয়। গভীর রাতে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে ভিজে যায় বিছানা, কাপড় আর শরীর। রোদের দিনেও কষ্ট কম নয়। প্রচণ্ড গরমে খোলা আকাশের নিচে থাকতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ার শঙ্কায় রয়েছেন তারা।
১২ বছর বয়সী ছেলে পরানও মায়ের সঙ্গে কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। পড়াশোনার বয়সে তাকে এখন ভাবতে হচ্ছে কোথায় রাতে ঘুমাবে, কীভাবে বৃষ্টি থেকে বাঁচবে। শিশু বয়সেই দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে সে।
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে গুলেজা বলেন, “আমার প্রতিবন্ধী স্বামী সাত বছর ধরে নিখোঁজ। কোথায় আছে, বেঁচে আছে কি না কিছুই জানি না। ছেলে নিয়ে মানুষের সাহায্যে বেঁচে আছি। অনেক সময় ঠিকমতো খাবারও জোটে না। তারপরও ছোট্ট একটা ঘরে ছিলাম। কিন্তু ঝড়ে সেই ঘরটাও ভেঙে গেল। এখন খোলা আকাশের নিচে থাকতে হচ্ছে। বৃষ্টি এলে খুব ভয় লাগে। আমার ছেলেটাকে নিয়ে কোথায় যাবো বুঝতে পারছি না। এতদিন হয়ে গেল, কেউ খোঁজ নিতে আসেনি। সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষের কাছে আমার আকুতি—আমাকে একটি ঘর করে দিন।”
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, গুলেজা দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত কষ্টে জীবনযাপন করছেন। ঝড়ে ঘর ভেঙে যাওয়ার পর তার দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। দ্রুত প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে এসে তার জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
এলাকাবাসীর দাবি, অসহায় এই মা-ছেলের পাশে দাঁড়ানো এখন মানবিক দায়িত্ব। একটি নিরাপদ আশ্রয় পেলে অন্তত খোলা আকাশের নিচে অনিশ্চয়তার জীবন থেকে মুক্তি পাবে গুলেজা ও তার শিশু সন্তান।