মাদারগঞ্জ ০৭:১৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম ::
Logo মাদারগঞ্জের যুবকের রহস্যজনক মৃত্যু, সুষ্ঠু তদন্তের দাবি স্বজনদের Logo সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা- মোসলেমাবাদ মুসল্লিবাড়ির রাস্তায় জনদুর্ভোগ Logo ১৮ ঘণ্টার লোডশেডিংয়ে মাদারগঞ্জ বিপর্যস্ত, স্থবির জনজীবন Logo ‎সেতুর অভাবে পূর্ণতা পাচ্ছে না মাদারগঞ্জের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র মোসলেমাবাদ মেট্রো সড়ক Logo চলচ্চিত্র সাংবাদিক চির কুমার আসলাম ইকবাল বাদলের মৃত্যু Logo মাদারগঞ্জে হিট স্ট্রোকে আরও একজনের মৃত্যু Logo মাদারগঞ্জে বজ্রপাতে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী অজ্ঞান Logo মাদারগঞ্জের বেতাগায় পানিতে ডুবে দেড় বছরের শিশু ইয়ামিনের মর্মান্তিক মৃত্যু Logo কাদাপানি আর খানাখন্দের দিন শেষ, বদলে যাচ্ছে জোনাইল বটতলা সড়ক Logo সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কে ‘পুকুর’! মাদারগঞ্জে হাজারো মানুষের নিত্যদিনের ভোগান্তি

মদিনায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন জামালপুরের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক আব্দুল হাই বুলু

আকাশ মন্ডল মাদারগঞ্জ (প্রতিনিধি)
  • প্রকাশ : ০৪:২৮:০৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
  • / ৫৩৮ বার পড়া হয়েছে

জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার বালিজুড়ী এফ এম উচ্চ বিদ্যালয়ের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী, আদর্শ মানুষ ও জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃত আব্দুল হাই বুলু বিএসসি স্যার (৬১) পবিত্র হজ পালন করতে গিয়ে সৌদি আরবের মদিনায় স্ট্রোকে মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর মৃত্যু সংবাদ দেশে পৌঁছানোর পর মাদারগঞ্জসহ পুরো জামালপুর জেলার শিক্ষা অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ৮টার দিকে কিং ফাহাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তাঁর স্ত্রী ও হজসঙ্গী সমসাদ আরা রেবা।
শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও এলাকাবাসী এই সংবাদে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন। অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না যে, যিনি সারাজীবন মানুষের মাঝে জ্ঞান, নীতি ও আদর্শের আলো ছড়িয়েছেন, সেই মানুষটি আজ আর আমাদের মাঝে নেই।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, জীবনের অন্যতম বড় ইচ্ছা পূরণে পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে গত ২৩ এপ্রিল স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবের মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন তিনি। পরে মদিনায় অবস্থানকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রথমে বুকে ব্যথা অনুভব করলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে স্ট্রোক করলে চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আব্দুল হাই বুলু স্যার জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার গুনারীতলা ইউনিয়নের মোসলেমাবাদ গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বালিজুড়ী এফ এম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিষ্ঠা, সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে বিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা, শিক্ষার মানোন্নয়ন, সহশিক্ষা কার্যক্রম ও পরীক্ষার ফলাফলে ব্যাপক উন্নতি ঘটে।
তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা দেননি, শিখিয়েছেন মানবতা, নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও শৃঙ্খলার পাঠ। তাঁর কঠোরতা ছিল শাসনের জন্য, আর কোমলতা ছিল স্নেহের জন্য। তাই তিনি ছিলেন হাজারো শিক্ষার্থীর হৃদয়ের মানুষ।
শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন। এই সম্মাননা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং মাদারগঞ্জ উপজেলার জন্যও গর্বের বিষয় ছিল। একজন গ্রামীণ শিক্ষক হয়েও তিনি প্রমাণ করেছিলেন নিষ্ঠা থাকলে যে কোনো স্থান থেকেই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা সম্ভব।

সহকর্মীরা জানান, তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে, নম্র ও ভদ্র স্বভাবের মানুষ। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের সঙ্গে সবসময় সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করতেন। কোনো সমস্যা হলে ধৈর্য ধরে শুনতেন এবং সমাধানের চেষ্টা করতেন। তাঁর নেতৃত্বগুণ ও মানবিক আচরণ সবাইকে মুগ্ধ করত।
সম্প্রতি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী অবসর গ্রহণ করেন তিনি। অবসর জীবনে ইবাদত-বন্দেগি ও সমাজসেবায় সময় দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। সেই লক্ষ্য নিয়েই তিনি পবিত্র হজে যান। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—হজের সফরই হয়ে উঠলো তাঁর জীবনের শেষ সফর।
পবিত্র ভূমি মদিনায় তাঁর মৃত্যু হওয়ায় এলাকাবাসীর অনেকেই এটিকে সৌভাগ্যের মৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করছেন। ধর্মপ্রাণ মানুষ হিসেবে তিনি সারা জীবন সৎ পথে চলেছেন এবং শেষ বিদায়ও হলো ইসলামের পবিত্র নগরীতে—এ কথা শুনে অনেকে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
পরিবার জানিয়েছে, জানাজা শেষে তাকে মদিনার ঐতিহাসিক বাকিউল গারকাদ কবরস্থানে দাফন করা হবে।
তাঁর মৃত্যুতে বালিজুড়ী এফ এম উচ্চ বিদ্যালয় পরিবার জানিয়েছে, “আমরা হারালাম একজন অভিভাবক, একজন সফল প্রশাসক, একজন আদর্শ শিক্ষক ও মহান মানুষকে। তাঁর শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক নেতৃবৃন্দ, সামাজিক সংগঠন ও বিভিন্ন মহল তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁরা মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর গড়া অসংখ্য শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন স্থানে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। তাঁদের সাফল্যের মাঝেই বেঁচে থাকবেন প্রিয় শিক্ষক আব্দুল হাই বুলু স্যার।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

মদিনায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন জামালপুরের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক আব্দুল হাই বুলু

প্রকাশ : ০৪:২৮:০৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার বালিজুড়ী এফ এম উচ্চ বিদ্যালয়ের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী, আদর্শ মানুষ ও জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃত আব্দুল হাই বুলু বিএসসি স্যার (৬১) পবিত্র হজ পালন করতে গিয়ে সৌদি আরবের মদিনায় স্ট্রোকে মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর মৃত্যু সংবাদ দেশে পৌঁছানোর পর মাদারগঞ্জসহ পুরো জামালপুর জেলার শিক্ষা অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ৮টার দিকে কিং ফাহাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তাঁর স্ত্রী ও হজসঙ্গী সমসাদ আরা রেবা।
শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও এলাকাবাসী এই সংবাদে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন। অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না যে, যিনি সারাজীবন মানুষের মাঝে জ্ঞান, নীতি ও আদর্শের আলো ছড়িয়েছেন, সেই মানুষটি আজ আর আমাদের মাঝে নেই।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, জীবনের অন্যতম বড় ইচ্ছা পূরণে পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে গত ২৩ এপ্রিল স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবের মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হন তিনি। পরে মদিনায় অবস্থানকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রথমে বুকে ব্যথা অনুভব করলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে স্ট্রোক করলে চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আব্দুল হাই বুলু স্যার জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার গুনারীতলা ইউনিয়নের মোসলেমাবাদ গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বালিজুড়ী এফ এম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিষ্ঠা, সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে বিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা, শিক্ষার মানোন্নয়ন, সহশিক্ষা কার্যক্রম ও পরীক্ষার ফলাফলে ব্যাপক উন্নতি ঘটে।
তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা দেননি, শিখিয়েছেন মানবতা, নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও শৃঙ্খলার পাঠ। তাঁর কঠোরতা ছিল শাসনের জন্য, আর কোমলতা ছিল স্নেহের জন্য। তাই তিনি ছিলেন হাজারো শিক্ষার্থীর হৃদয়ের মানুষ।
শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন। এই সম্মাননা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং মাদারগঞ্জ উপজেলার জন্যও গর্বের বিষয় ছিল। একজন গ্রামীণ শিক্ষক হয়েও তিনি প্রমাণ করেছিলেন নিষ্ঠা থাকলে যে কোনো স্থান থেকেই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা সম্ভব।

সহকর্মীরা জানান, তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে, নম্র ও ভদ্র স্বভাবের মানুষ। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের সঙ্গে সবসময় সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করতেন। কোনো সমস্যা হলে ধৈর্য ধরে শুনতেন এবং সমাধানের চেষ্টা করতেন। তাঁর নেতৃত্বগুণ ও মানবিক আচরণ সবাইকে মুগ্ধ করত।
সম্প্রতি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী অবসর গ্রহণ করেন তিনি। অবসর জীবনে ইবাদত-বন্দেগি ও সমাজসেবায় সময় দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। সেই লক্ষ্য নিয়েই তিনি পবিত্র হজে যান। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—হজের সফরই হয়ে উঠলো তাঁর জীবনের শেষ সফর।
পবিত্র ভূমি মদিনায় তাঁর মৃত্যু হওয়ায় এলাকাবাসীর অনেকেই এটিকে সৌভাগ্যের মৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করছেন। ধর্মপ্রাণ মানুষ হিসেবে তিনি সারা জীবন সৎ পথে চলেছেন এবং শেষ বিদায়ও হলো ইসলামের পবিত্র নগরীতে—এ কথা শুনে অনেকে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
পরিবার জানিয়েছে, জানাজা শেষে তাকে মদিনার ঐতিহাসিক বাকিউল গারকাদ কবরস্থানে দাফন করা হবে।
তাঁর মৃত্যুতে বালিজুড়ী এফ এম উচ্চ বিদ্যালয় পরিবার জানিয়েছে, “আমরা হারালাম একজন অভিভাবক, একজন সফল প্রশাসক, একজন আদর্শ শিক্ষক ও মহান মানুষকে। তাঁর শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক নেতৃবৃন্দ, সামাজিক সংগঠন ও বিভিন্ন মহল তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁরা মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর গড়া অসংখ্য শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন স্থানে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। তাঁদের সাফল্যের মাঝেই বেঁচে থাকবেন প্রিয় শিক্ষক আব্দুল হাই বুলু স্যার।